১৯৫৭ সালের কুড়িগ্রাম চর রাজিবপুরে জন্মানো এই নারি ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সে ১৯৭১সালে মুহিব হাবিলদারে প্রেরণায় ১১ নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধের খাবার যোগান দিতেন। পরবর্তিতে তার সাহস আর শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদার ও তার সহযোদ্ধারা তাকে অস্ত্র চালনা শেখায়। যখন রাজিবপুর সংকর মাধবপুরে পাক সেনারা ক্যম্প করে তখন মুহিব হাবিলদার তারামনকে বলে, তোমার এলাকা তুমি কি ছদ্ধ বেশে তাদের কোন খোজ খবর এনে দিতে পারবা। তখন এই বীর নারী একবারের জন্য জীবনের মায়া না করে নিজের জীবন বাজি রেখে পাক শিবিরে ঢুকে তাদের খবর পৌছে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নানাভাবে। এজন্য কখনো ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদীগুলো সাতরিয়ে পার হতে হয়েছে তাকে কখনো আবার সাজতে হয়েছে ময়লা বা বিষ্টা গায়ে জড়িয়ে পাগল।
যুদ্ধের একদিন মাঝদুপুরে মুক্তিযোদ্ধারা খেতে বসেছে তারামন বিবি সুপারি গাছে উঠে দুরবিন দিয়ে দুরে দৃষ্টি রাখছে আর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে এমন সময় তার চোখে ধরা পড়ে একটা পাকসেনার গান বোড তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তারামন বিবি সাথে সাথে তাদের সহযোদ্ধাদের জানায় এবং অন্য ক্যম্পের মুক্তিবাহিনী ক্যম্পগুলোতে খবর পৌছে সবাইকে একত্রিত করে এবং সেদিন তারামন বিবি তার সহযোদ্ধাদের সাথে অস্থ হাতে দুপুর থেকে সন্ধা পযর্ন্ত যুদ্ধ করে পাক বাহিনীকে পরাস্থ করতে সক্ষন হন এছাড়া আরো অনেক সমুক্খ যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহনে নৈপুন্যতার সাথে যুদ্ধ করেছিলেন এই যোদ্ধা।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তার সাহসীকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য “বীর প্রতীক” উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্ত সে সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের এক গবেষক বিমল কান্তি দে কুড়িগ্রাম রাজীবপুর কলেজের অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকীর সহয়তায় প্রথম তার সন্ধান পান। এরপর নারীদের অধিকার নিয়ে কয়েকটি সংগঠন তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং ১৯শে ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার এক অনাড়ম্বর পরিবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে তারামন বিবিকে বীরত্বের পুরস্কার তার হাতে তুলে দেন।
তারামন বিবিকে নিয়ে আনিসুল হকের লেখা বই ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’ এবং আনিসুল হক রচিত ‘করিমন বেওয়া’ নামক একটি বাংলা নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন তারামন বিবি।
তারামন বিবি কুড়িগ্রাম জেলা চর রাজিবপুর স্বামী আবদুল মজিদ এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন। তারামন বিবি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থায় ভুগছিলেন। ১লা ডিসেম্বর ২০১৮ সালে স্বাধীনতার বিজয় মাসে তিনি নিজ বাসায় জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে রাজিবপুর উপজেলার কাচারীপাড়া তালতলা কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয়। এই বীরপ্রতীক হয়তো আর রক্তে মাংসে পৃথিবীর বুকে নেই তবে তার বীরত্বগাধা রয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়, আজীবন স্বরণীয় হয়ে থাকবে এই বীর প্রতীক তারামন বিবি।
লেখাঃ আসিফ ওয়াহিদ



0 Comments