বোতলের ছিপির ঠিক মাঝ কেন্দ্র বরাবর ছিদ্র করে ছিপিটা পানিভর্তি একটি বোতলে লাগিয়ে সেই বোতলের পেটে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিতেই কি সুন্দর সর-সর করে পানি বের হতো!
আহ্! কি রঙিন শৈশব! কি চমৎকার শৈশব!
কখনো তা দিয়ে একে অন্যকে পানি মেরে খেলতাম। পানি শেষের দিকে চলে গেলে আর বের হতো না। আবার নতুন করে পানি ভরতে হতো। একেকজন ভিজে চুপচুপে হয়ে যেতাম।
সেই ছিদ্র করা ছিপিওয়ালা বোতল দিয়ে খেলা ছাড়াও আরেকটা কাজে দিতো। মাটির টবে লাগানো ফুলের গাছে বেশ সময় ধরে সেচ দেয়া যায়। এ কাজে পরিশ্রম বেশি। কিন্তু শিশুর আনন্দ-ধৈর্য্যের কাছে তা পরাজিত। গাছটারও যে খুব একটা লাভ হতো এমনটাও না। ঘট করে মগ দিয়ে পানি ঢেলে দিলেও হয়, কিন্তু মজা কি তাতে মেলে? মায়ের জামা কিংবা শাড়ি, বিছানার কাপড় সেলাইয়ের পর বাড়তি উচ্ছিট্ট কাপড় আমরা সযত্নে যোগাড় করতাম। সেই ছোট ছোট উচ্ছিট্ট কাপড় দিয়ে বানাতাম নানান ঢঙের পুতুল। 

পুতুলগুলো হতো আড়াআড়িভাবে দুটো কাঠির উপর কিছু লম্বা কাপড় প্যাঁচানো বেশ শক্ত ধরণের। বর পুতুল থাকত, কনে পুতুল থাকত। হঠাৎ করেই বেশ সাজগোজে তাদের বিয়ে দিতাম। তখন থাকত মেলা থেকে কেনা খেলনা মাটির হাড়ি-পাতিলও। পুতুলগুলোর জন্যে আবার কিছু কাপড় দিয়ে জামা, ফতুয়া, শাড়ি বানিয়ে একটা জুতোর বাক্সে বেশ সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এইসব কান্ডকীর্তি নিয়ে মায়ের কিন্তু কম বকুনি খেতে হয়নি। মা বলতো, ‘ব্যাটা ছেলেদের এসব খেলতে নেই’। আমার বয়স তখন অনেক কম। কে অতসব ভাবতে যাচ্ছে! আর তখন আশপাশের সব ছেলে-মেয়েরা একসাথে কতই না ছুটোছুটি করেছি। এখন ভাবতে বসলে হাসি
পায়। আরেকটু বড় হতেই মনে পড়ে আমি পাড়ায় পাড়ায় ছেলেদের সাথে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতাম। বাড়ি ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াতাম প্রতিদিন। পড়াশুনা নিয়ে চিন্তা মাথায় ঘুরতো না। তা নিয়ে বাড়িতে চাপের মুখোমুখি এখনকার অন্যান্যদের মতো অতটা ছিলনা, যতটা এখন হয়। সেজন্যেই হয় চাপছাড়া পড়াশুনার মাঝে দূরন্ত শৈশব অধিক রঙিন ছিল।
আস্তে আস্তে শিখলাম ঘুড়ি উড়ানো, লাটিম খেলা, মার্বেল বল খেলা। ক্রিকেট খেলতাম প্রতি শুক্রবার। তখন অত সরঞ্জাম ছিল না আমাদের। একটা কাঠ জোগাড় করতাম ব্যাটের জন্যে। উপরের দিকটায় হালকা দু'পাশ দিয়ে কেটে হ্যান্ডেলের মতো বানাতাম। থাকতো সস্তায় দোকান থেকে কেনা রাবারের লাল বল।

পরবর্তীতে টেনিস বল দিয়ে, বাজারে কেনা ব্যাটে খেলেছি। খেলা এত ভালো লাগতো যে সপ্তাহের এক দিন হতে হতে প্রায় প্রতিদিনই খেলা চালু হয়ে গেল। পাড়ায় পাড়ায় টূর্নামেন্ট হতো। ছোটবেলায় এসব অতটা গুরুত্বসহকারে যে খেলা হতো তা না। শীতে এমনও হতো কেউ কেউ কাঠের গোল হাতাওয়ালা ব্যাট বানাতো ব্যাটমিন্টন খেলতে। অতটা সুবিধার না যদিও।
সবচাইতে আনন্দ পেতাম দৌড়ঝাপ, রঙ-বেরঙ, কানামাছি, লুকোচুরি ইত্যাদি খেলাগুলোতে।
আমাদের ছিল ‘ভুট্টুক’ নামক একধরণের বিশেষ পিস্তল, যা চিকন বাঁশের ছোট একটা টুকরার ভেতর উপযুক্ত বাঁশের কঞ্চি দ্বারা নিমবিচি প্রবেশ করিয়ে চাপের মাধ্যমে পটকা ফাটিয়ে গুলি মারা। এটা এককথায় অসাধারণ। অনেকে চমৎকারভাবে এসব ফাটাতে পারে।
পুকুরের সাঁতারে অবাধ প্রতিযোগিতা এখন শুধুই স্মৃতি।

আজকালকার ছেলে-মেয়েরা আমাদের ছেলেবেলার এসব খেলাধুলার গল্প জানে। খুব আগের গল্প সেসব নয়। শুধু নেই স্বাভাবিক পরিবেশ। নেই স্বাভাবিক পরিস্তিতি। পড়াশুনার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আমাদের শিশুরা। দায়ী আমরাই, আমাদের অভিভাবকেরাই। যারা দামি দামি খেলনা, পার্কে ঘুরাঘুরি, মোবাইল-ট্যাব, ফ্যান্টাসি ছেড়ে এইসব ছেলেবেলার সস্তা খেলাধুলাকে নিতান্তই গরীবের খেলা বলে অভিহিত করছেন তাদের চিন্তা-চেতনাকে আমি তিরষ্কার জানাই।

লেখক: নেওয়াজ শরীফ।